জি-সেভেনের টালমাটাল সময়

দ্য গার্ডিয়ানের সম্পাদকীয়
কানাডার কুইবেকে জি-সেভেন সম্মেলনের দৃশ্যমান ব্যর্থতা একুশ শতকের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর জন্য টালমাটাল পরিস্থিতি বয়ে নিয়ে এসেছে। এটা এমন এক মুহূর্ত যখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ বিরক্তির পর্যায় পেরিয়ে বিদ্যমান বাস্তবতা ক্ষতিগ্রস্ত করার আশঙ্কায় পৌঁছে গেছে। মি. ট্রাম্প যেন কেবল প্রতিবাদ জানাতেই ওই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। ঘনীভূত শুল্ক্ক যুদ্ধের ক্ষেত্রে তিনি কোনো আপসেরই উদ্যোগ নেননি। তিনি সম্মেলনে দেরিতে যোগ দিয়েছেন, অন্য নেতাদের সঙ্গে বাগ্‌যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন এবং নির্ধারিত সময়ের আগে সম্মেলন ত্যাগ করেছেন। তিনি চূড়ান্ত যৌথ ঘোষণা উপেক্ষা করেছেন এবং যেতে যেতে বিমান থেকে তার কানাডীয় স্বাগতিককে অপমানসূচক টুইট করেছেন। আমেরিকান গণতান্ত্রিক মিত্রদের পেছনে ফেলে তিনি উত্তর কোরীয় একনায়কের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে উৎসাহব্যঞ্জক অভিব্যক্তি দেখিয়েছেন।

এর তাৎক্ষণিক ফলই বেশ খারাপ। যুক্তরাষ্ট্র সম্মেলনের যে যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষরে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তা এমনিতেই খুব দুর্বল ছিল। বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে। তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতির প্রয়োজন ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম শুল্ক্ক' দ্বিমতের একটি ইস্যু ছিল বটে; কিন্তু বাণিজ্যের আরও অনেক বিষয়ে দুই পক্ষের ঐকমত্যও ছিল। এর একটি হচ্ছে চীনের কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তর না করা। যৌথ ঘোষণায় রাশিয়ার 'অস্থিতিশীলতা কৌশল' মোকাবেলা নিয়েও ঐকমত্য ছিল। সেই আলোচকেই ইরানের পরমাণু প্রযুক্তি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ রাখার ঐকমত্য ছিল। দেশটিতে নারী-পুরুষ সমতা আনার ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগের কথা ছিল। কিন্তু এর কোনোটিই ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন গলাতে পারেনি। জি-সেভেনের এই তাৎক্ষণিক বিভাজনের সুদূরপ্রসারী ক্ষতি হবে আরও বেশি।

কেউ যুক্তি দেখাতে পারেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই দেশটির মিত্ররা এমন পরিস্থিতি দেখে আসছে। তারা সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে এই আশায় যে, সময়ের ব্যবধানে এটা কেটে যাবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাতিল করে দেওয়া যায় না। কিন্তু এটা একই সঙ্গে অতি আশাবাদী অবস্থান।

বাস্তবতা এখন আরও গুরুতর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ব ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি এই স্তম্ভ সরিয়ে নিতে চান, তাহলে বাকি সবই হুমকির মুখে পড়বে। সেটা এখনও ঘটেনি। কিন্তু জি-সেভেনের বাকি মিত্রদের ধন্যবাদবিহীন আত্মত্যাগের বিপরীতে 'ট্রাম্পিয়ন বিঘ্ন' সে ক্ষেত্রে অব্যাহতই থাকতে হবে। পরস্পরের প্রতি আস্থাহীনতা ক্রমেই বাড়ছিল; কুইবেক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে তা আরও প্রশস্ত হলো।

মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া জি-সেভেন দেশগুলো জোট হিসেবে খুব বেশি কার্যকর ও প্রভাবশালী হবে না। ইউরোপ থেকে যোগ দেওয়া চার দেশের মধ্যে কেবল ফ্রান্সের ক্ষমতা রয়েছে কোনো বিষয়ে একক শক্তিশালী অবস্থান নেওয়ার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের 'ট্রাম্পনীতি' অব্যাহত থাকলে জি-সেভেনের বাকি দেশগুলোকে অবশ্যই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বিকল্প প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। সেটা না হলে, ফ্রান্স ছাড়া বাকি ইউরোপ, কানাডা ও জাপানকে রাশিয়ার অস্থিতিশীলতা কৌশল, চীনের কৌশলগত কর্তৃত্ববাদ মোকাবেলায় অসম্মানজনক পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এর সঙ্গে যোগ হতে পারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'নেটিভিজম'।

জি-সেভেনের এই পরিস্থিতি বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার উদার গণতন্ত্র, শান্তি ও স্থিতিশীলতা, অবাধ বাণিজ্য, মুক্তি ও স্বাধীনতার মূলবোধগুলোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এই হুমকি মোকাবেলার ক্ষেত্রে উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সক্ষমতাকেও ফেলেছে হুমকিতে।

দ্য গার্ডিয়ান থেকে ঈষৎ সংক্ষেপে ভাষান্তরিত
সূত্র: সমকাল